'পুজোর সেকাল একাল'

    


    বাঙালী মাত্রই শারদীয়া দুর্গাপুজোর অর্থ শরতের সুনীল আকাশ, মাঠ ভরা কাশফুল,শিউলি ফুলের গন্ধ, মহালয়ার দিন পিতৃ পক্ষের অবসানের সাথে সাথে দেবী পক্ষের সুচনা, নতুন জামা কাপড়ের পুজোর আনন্দ মাখা গন্ধ, ঢাকের আওয়াজের তালে কোমর দোলানো, পঞ্চমি থেকে দশমি পূজো মণ্ডপে প্রাণ খোলা আনন্দ ,অষ্টমির দিন  মায়ের পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া, সন্ধি পুজোর ভাব গম্ভীর পরিবেশ,দশমীর দিন পাড়ার মা,মাসি, কাকিমাদের পতিগৃহে রওনা হওয়ার আগে 'মা' কে বরণ করে মিষ্টি মুখ করানো ও নিজেদের মধ্যে সিঁদুর খেলা।  সেকাল ও একালের পুজোর মধ্যে এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য এক থাকলেও কোথাও যেন একটা আত্মীক বন্ধনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

    ত্রিশ,চল্লিশ বছর আগে প্রতিটা শহর বা গ্রামে খুব স্বল্প সংখ্যক পুজো অনুষ্ঠিত হত কারণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্য এখনকার মত ছিল না। বারোয়ারি পুজোর পাশাপাশি কিছু বনেদি বাড়িতেও দুর্গা পুজো অনুষ্ঠিত হতো। শিশু, কিশোর, কিশোরীদের পুজোর আনন্দ শুরু হয়ে যেত ছোট ,বড় জামা কাপড়ের দোকানে বাবা, মার হাত ধরে পুজোর নতুন পোশাক কিনতে যাওয়ার দিন থেকেই অথবা দর্জির দোকানে যেদিন জামা, প্যান্ট তৈরী করতে দেওয়া হতো সেদিন থেকেই। নতুন জামা কাপড় ট্রাঙ্ক থেকে বের করে বারবার দেখার আনন্দ এবং সেই আনন্দ বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও অন্য রকম স্বাদ ছিল। বিভিন্ন পত্রিকার পুজো বার্ষিকী সংখ্যা হাতে পাওয়া ও পুজোর গান শোনার মধ্যেও ছিল অন্য রকম আনন্দ ।

    তখন প্রত্যেকেরই বাড়িতে রেডিও ছিল। মহালয়ার ভোরে শাঁখের ধ্বনি আর বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডি পাঠের মধ্যে দিয়ে বাঙালির ঘুম ভাঙতো। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ বাবুর স্তোত্রপাঠের গাম্ভীর্য ভরা কণ্ঠে সবাই মুখরিত হয়ে উঠত। পরিবারের সবার সাথে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার মধ্যে দিয়েই তার আগমনীর সুর বেজে উঠত আমবাঙালির মনে। মহালয়া থেকে পঞ্চমি পর্যন্ত এই কটা দিন সব বয়সের বাঙালির দু চোখ ভরা থাকতো পুজোর আনন্দের স্বপ্নে। আনন্দের শুরু হত ষষ্ঠির দিন বোধনের মাধ্যমেই দুর্গাকে আবাহন করার মধ্যে দিয়ে। বেশিরভাগ জায়গাতেই পুজোকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয়ে যেত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রত্যেকেই চেষ্টা করতো নিজের নিজের মত করে এই সমস্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সবাই কে আনন্দ দেওয়ার। 

    সপ্তমীর সকালে মহিলাদের উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির সাথে সাথে পুরোহিতদের নবপত্রিকাকে নদী বা পুকুরে স্নান  করাতে নিয়ে যাওয়া ও নবপত্রিকাকে নতুন শাড়ি পড়ানো দেখতে যাওয়ার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পেত সবাই। পুজোর মণ্ডপে এক বা  একাধিক ধুনুচি নিয়ে নাচের প্রতিযোগিতাও ছিল উপভোগ্য। পুজোর কদিন বাড়িতে নানারকমের সুস্বাদু রান্না ও তার সাথে মা, জেঠিমাদের হাতে তৈরী নারকেল নাড়ু, মোয়ার স্বাদ ভোলার নয়। বিসর্জনের পরে বাড়ির গুরুজনদের ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে প্রণাম করা ও মিষ্টি মুখ করার মধ্যেও ছিল প্রাণভরা আনন্দ। তখনকার পুজোর জাঁকজমক এখনকার মতো না থাকলেও আনন্দের কোন অভাব ছিল না। এখন পুজোর কেনাকাটার জন্য প্রত্যেকেই পছন্দ করে শপিং মল। ছোট দোকানের গরম পরিবেশে বিভিন্ন দোকানে ঘুরে ঘুরে জিনিস কেনার আনন্দ থেকে মলের ঠান্ডা আবহাওয়া তে কেনাকাটা করতে বেশিরভাগ মানুষই পছন্দ করেন।

    এছাড়াও অনলাইনে কেনাকাটার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাড়িতে বসে পছন্দ মতো জিনিস পেয়ে যাওয়ার কারণে সেই দিকেও ক্রেতারা ঝুঁকছেন।এখনকার মানুষের ক্রয় ক্ষমতা আগের তুলনায় অনেকটাই বেশি এবং বেশিরভাগ পরিবারই এখন অনু পরিবার।স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেকেই খুব সহজেই তাদের কাঙ্খিত জিনিস চাইলেই পেয়ে যায়। যার ফলে পুজোর নতুন পোশাক কেনার আনন্দ কেউই আর সেই ভাবে অনুভব করেন না। স্বাধীনতা দিবস অথবা প্রজাতন্ত্র দিবসের গুরুত্ব উপলব্ধি না করে অনেকেই যেমন নিখাদ ছুটির দিন হিসাবে এই দিন গুলোকে গণ্য করে । কর্মক্ষেত্রের চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে পুজোর ছুটির দিন গুলোও এখন অনেকের কাছেই সেই রকম। মা,বাবা এখন বেশিরভাগ সংসারেই ব্রাত্য ।  মায়ের হাতের রান্নার পরিবর্তে অনলাইনে অর্ডার করা নানারকমের দেশি বিদেশী খাবার খেতেই পুজোর কদিন সবাই বেশি পছন্দ করেন। খুব কম সংখ্যক বাঙালি মানুষের বাড়িতে এখন রেডিও আছে। স্বাভাবিকভাবেই মহালয়ার ভোরে রেডিওতে বীরেন্দ্র বাবুর গুরুগম্ভীর গলায় চণ্ডীপাঠ ও 'মহিষাসুরমর্দিনী' শোনা কে  ঘিরে সবার মাঝে উন্মাদনা আর সেই ভাবে দেখা যায় না। যদিও নেট সংযোগ যুক্ত মুঠো ফোনের দৌলতে তা সবসময় ইউটিউবে শুনতে পাওয়া যায়। 

    কোন কিছু সহজেই পাওয়া গেলে  তার মূল্য ও গুরুত্ব দুটোই হারিয়ে যায়। এক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। এনড্রয়েড  ফোনই এখন সবার সেরা বন্ধু। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, ম্যাসেন্জার ইত্যাদির মধ্যেই  যত আনন্দ লুকিয়ে রয়েছে। যার ফলে পাড়ার পুজোর মণ্ডপে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও সেখানে উপস্থিত থেকে খুব কম সংখ্যক মানুষ আনন্দ নিতে পারেন। পুজো মণ্ডপে ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতাও আর দেখা যায় না। হাতে গোনা কয়েকজন এখন নবপত্রিকাকে স্নান করানো দেখতে যান । কোন কোন মণ্ডপে সাবেকি প্রতিমার পরিবর্তে থিম পুজোর প্রচলন জনপ্রিয়তা পেলেও সাবেকিয়ানার অবলুপ্তি ঘটছে। বিজয়া দশমীর দিন প্রতিবেশীদের বাড়িতে মিষ্টি পাঠানো বা তাদের বাড়িতে গিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করে মিষ্টি মুখ করার রেওয়াজ, বন্ধুদের মধ্যে কোলাকুলি ও বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়  একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে বললেই চলে। পরিবর্তনশীল এই পৃথিবীতে দুর্গাপুজো কে কেন্দ্র করে আগামীতে আর কি কি পরিবর্তন দেখতে হবে তা সময়ই বলবে। 

পার্থ সারথী মণ্ডল

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ